ফেনী |
২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং | ৭ ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

| তথ্য ও প্রযুক্তি | লিড

রাফির কবরে ফুল ফুটেছে, খুনিরা কনডেম সেলে

natun feniমোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:৩৬ অপরাহ্ণ, ২৬ অক্টোবর ২০১৯

নুসরাত জাহান রাফি নামটি এখন বিশ্ব মিডিয়ায় আলোচিত। চলতি বছর ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার কক্ষে যৌন নিপীড়নের পর থেকে পুরো ঘটনা প্রবাহই মিডিয়ায় কল্যাণে বিশ্বময়। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে শুরু থেকেই ঘটনাটি পর্যবেক্ষণে রয়েছে। আমার মনে পড়ছে, রাফির লিখে যাওয়া ডায়েরির কথাগুলো। বান্ধবীকে রাফি লিখেছিল, ‘তামান্না, সাথী। তোরা আমার বোনের মতো এবং বোনই। ঔ দিন তামান্না আমায় বলেছিল, আমি নাকি নাটক করতেছি। তোর সামনেই বললো। আরো কি কি বললো, আর তুই নাকি নিশাতকে বলেছিস আমরা খারাপ মেয়ে। … তোরা সিরাজ উদ দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কীভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস। তোরা জানিস না, ওইদিন রুমে কি হইছে ? উনি আমার কোন জাগায় হাত দিয়েছে এবং আরো কোন জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছে, উনি আমায় বলতেছে- নুসরাত ডং করিসনা। … আমি লড়বো শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশাআল্লাহ।’




রাফির কথাগুলো যেকোন পাষাণ হৃদয়কেও নাড়া দেয়। সত্যি রাফি হারেনি। সে যে কঠিনতম শাস্তি চেয়েছিল তাই ত হওয়ার পথে। এক অপরাধ ঢাকতে ৬ এপ্রিল যারা তাকে পুড়িয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল সেই ঘটনায় জড়িত ১৬ খুনি আজ ফাঁসির দন্ড নিয়ে কনডেম সেলে। অন্যদিকে ফুল ফুটেছে রাফির কবরে। এ যেন রাফিকে দেয়া প্রকৃতির শুভবার্তা।

২৪ অক্টোবর বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণাকালে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো: মামুনুর রশিদ বলেছেন, ‘সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদরাসা ফেনী জেলার অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ। দুই হাজারেরও অধিক ছাত্র-ছাত্রী তথায় অধ্যয়নরত। এলাকার শিক্ষা সম্প্রসারণে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলোকজ্জ্বল ভূমিকায় কালিমালিপ্তকারী এ ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফির তেজদীপ্ত আত্মত্যাগ তাঁকে ইতোমধ্যে অমরত্ব দিয়েছে। তাঁর এ অমরত্ব চিরকালের অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি আসামীদের ঔদ্বত্য কালান্তরে মানবতাকে লজ্জিত করবে নিশ্চয়। বিধায়, দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তিই আসামীদের প্রাপ্য।’

৬ এপ্রিলের মর্মন্তুদ ঘটনাটি যেমন বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল তেমনি ২৪ অক্টোবরের রায়টিও হয়েছে ঐতিহাসিক। মাত্র সাড়ে ৬ মাসে ৬২ কার্যদিবসে এমন একটি চাঞ্চল্যকর মামলা নিষ্পত্তি দেশের বিচারাঙ্গনে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। শুধু তাই নয়, মামলাটি তদন্তও হয়েছে দ্রুততম সময়ে। মাত্র ৫২ দিনে ৩৩ কার্যদিবসে পিবিআই মামলাটির তদন্ত শেষে চার্জশীট জমা দেয়। এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে। মামলার সঙ্গে জড়িত আইনজীবী, গণমাধ্যম কর্মী, তদন্তকারি সংস্থা, ভুক্তভোগী পরিবার সবাই একবাক্যে এ কথাটি আজ স্বীকার করতে বাধ্য। এতে করে দেশের বিচার বিভাগের উপর জনআস্থা যেমন বাড়বে তেমনি যেকোন অপরাধ প্রবণতায় প্রতিবাদী হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষ। এমন আশা জাগিয়েছে নুসরাত হত্যা মামলা।




শুরু থেকে সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেন খুনিদের রক্ষায় ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের অপচেষ্টা করেন। পরিকল্পিত এ হত্যাকান্ডকে তিনি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেন। আর তাকে সমর্থন দেন তৎকালীন পুলিশ সুপার এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার। যখন নুসরাতের ঘটনাটি নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রতিবাদ-নিন্দার ঝড় উঠে, উধ্বর্তন পুলিশ কর্মকর্তারা বারবার ঘটনা তদন্তে সোনাগাজী ছুটে আসেন। তখনও ঘটনাস্থলে যেতে অনীহা করেন এসপি। কিন্তু গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের চক্রান্তে বাধ সাধেন। তারা হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে মরিয়া হয়ে কাজ করেন। সবকিছুর মোড় ঘুরে যায় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তায়। তিনি একদিকে নুসরাতের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা অন্যদিকে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে নির্দেশ দেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে নুসরাত। শুধু ফেনী-সোনাগাজী নয়, নুসরাতের মৃত্যু দেশবাসীকে কাঁদায়। সারাদেশে তৈরি হয় এক শোকাবহ পরিবেশ। এদিনই মামলা চলে যায় পিবিআই এর হাতে। তখনি গতি পায় তদন্ত। একেএকে গ্রেফতার হতে থাকে জড়িতরা। পুলিশ সদর দপ্তরেও টনক নড়ে।

তদন্তে কর্তব্যে অবহেলার প্রমাণ মেলায় এসপি জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেন সহ চার পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার হন। অবশ্য পরবর্তীতে ওসি মোয়াজ্জেম বরখাস্ত এমনকি বেআইনীভাবে নুসরাতের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে কারাবন্দী রয়েছেন। তবুও মামলার অভিযোগপত্রে এসপি-ওসির নাম না থাকায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন এ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারি পিবিআই। সমালোচনা উঠেছে, ধিকৃত সিরাজকে রক্ষায় আওয়ামীলীগ সভাপতি রুহুল আমিন সহ অন্যরা যে ভূমিকা রেখেছেন তার চেয়ে কম অপরাধ করেননি এসপি-ওসি। একইভাবে দুনিয়া কাঁপানো এ মামলার নিষ্পত্তি যেমন দ্রুতসময়ে হয়েছে এর রায় কার্যকরও যেন অতিদ্রুত হয় সেই আশাই করছে দেশবাসী।




বিজ্ঞজনরা মনে করছেন, এ রায় দ্রুত কার্যকরের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন যেমন সমুজ্জল হবে তেমনি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করার সাহস পাবেনা অপরাধীরা। মেয়ে হারানোর শোকে অসুস্থ রাফির মা-বাবাকে শান্তনা দেয়ার সাহস কারই বা আছে। তার তিন ভাই সহ স্বজনরাও এখনো তার স্মৃতি খুঁজে ফেরে। তবুও অনেক রাফিই তো নানা ঘটনায় আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যায়। কিন্তু নুসরাত রাফি তো প্রতিবাদ করেই প্রাণ বিলিয়েছে। যে আত্মত্যাগ তাকে অমরত্ব দিয়েছে। অপরদিকে খুনি ও তাদের সহযোগিরা ইতিহাসের পাতায় সবসময় নিন্দনীয় হয়ে থাকবে। মানবতাকে করবে লজ্জিত। আমরা আর কোন রাফিকে হারাতে চাই না।
লেখক : সম্পাদক, দৈনিক ফেনীর সময়।

আপনার মতামত দিন

Android App
Android App
Android App
© Natun Feni. All rights reserved. Design by: UTSHA IT