পরিমণীর জেল জয়! • নতুন ফেনীনতুন ফেনী পরিমণীর জেল জয়! • নতুন ফেনী
 ফেনী |
১০ আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পরিমণীর জেল জয়!

শরীফুল ইসলাম অপুশরীফুল ইসলাম অপু
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:১১ অপরাহ্ণ, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১

তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন । কথাগুলো এভাবে বললেও একবারে খারাপ হবেনা । তিনি লাইভে এলেন,গ্রেফতার হলেন,জেলে গেলেন এবং জেল জয় করে বের হলেন । জেল জয় করে বের হলেন, কথার সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন । তবে এ আমার কথা নয়,এটি মূলত মুক্ত হবার পর তার ফটোশুট দেখে অনুমেয় । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বাদই দিলাম, দেশের মূল ধারার প্রায় সবগুলো গণমাধ্যমে এ ছবিগুলো দেখে জেল জয় ছাড়া ভিন্ন অনুভূতি আমার মধ্যে অন্তত আসেনি । অনেককে লিখতে দেখলাম, কারামুক্ত হয়ে এরকম মিডিয়া কাভারেজ নাকি সর্বশেষ নেলসন ম্যান্ডেলা পেয়েছিলেন ! সিরিয়াসলি ! লেখকদের মধ্যে গণমাধ্যমকর্মীও নেহাৎ কম নয়, তাই তাদের তথ্য ভুল ভাবারও অবকাশ নেই । রাজনৈতিক ছাড়া এমন আলোচনায় আসাটা মুড়ির মোয়া নয় কিন্তু ।

এই ‘তিনি’ যে হালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া ‘পরীমনি’ সেটি বুঝতে কারও বাকী থাকার কথা না । তার বাড়িতে হামলার আশংকায় খবর করলো গণমাধ্যম, পরে জানা গেলো সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। সেটিও খবর হলো, গ্রেফতার হয়েছেন তিনি-সেটিও খবর, গ্রেফতারের আগে কি পরে লাইভে এসেছেন সেটাও খবর, জিজ্ঞাসাবাদ এর জন্যে নিয়ে যাবার সময় তিনি কি পরেছেন সেটাও খবর। এরপরতো তার জন্য বারবার রিমান্ড চাওয়া, আদালত থেকে বের হয়ে চিৎকার দিয়ে সাংবাদিকদের শাসানো সবই এদেশের ‘মুখরোচক’ খবর। আমাদের নিষ্প্রাণ গণ-মাধ্যম যেনো জেগে উঠেছিলো এই খবরের সন্ধানে। সে তুলনায় জামিন পেয়ে মুক্ত হয়ে ওড়না কে মাথায় পাগড়ি বানিয়ে চোখ সানগ্লাসে ডেকে মেহেদী লাগানো হাত নাড়িয়ে ‘জয়ীর’ মুডে থাকা ছবিগুলো খবরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে, এটাই স্বাভাবিক । মুক্ত হয়ে বাসা ছাড়ার নোটিশ নিয়েও খবর, পরে তিনিই জানালেন বিষয়টি ঠিক ওরকম নয়।এটিও গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খবর !

তাকে যে অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, সেটিতে যে তাকে শিগ্রই ছাড়তে হবে এটা কে না জানে। শুধু জানার ছিলো তার বের হবার স্টাইলটা কেমন। জামিনের কারণ হিসেবে আসামি একজন নারী ও তার শারীরিক অসুস্থতার কথা বিনেচনায় রাখা হয়েছে। কিন্তু মুক্ত ‘পরীমনির’ মুখচ্ছবি কি সেসব বলে !

গ্রেফতার হয়ে ছেলে-বুড়ো-নারী সকলের ট্রল এর স্বীকার হওয়া পরীমনি এবার পাচ্ছেন বাহবা। আহা এ না হলে ‘আয়রন লেডি’। বাহ এ যেনো একটি জাতি-গোষ্ঠীর স্বাধীনতায় নিজেকে উৎসর্গ করা এক মহতী নারীর জেল প্রত্যাবর্তন। তার গ্রেফতার যেমন বাড়াবাড়িতে ভরপুর ছিলো, তেমনি তার মুক্তিতে সেটি ছাড়িয়েছে বহুগুণ । পরীমনি যে সেই মাপের একজন এটেনশন সিকার, এটি আর সন্দেহের অবকাশ রইলো না । বেচারি যে কেবল এটেনশন নিতে গিয়ে কারাবাস গ্রহণ করতে হয়েছে, এটি নিয়েও এখন আর তর্ক হবার নেই । অপরাধ টা এখানে যে মূল বিষয় নয়, এটি অনেকটা পরিষ্কার ।

আমি ভাবছি আমাদের গণমাধ্যমের কথা। পরীর মতো করে আমাদের গণমাধ্যম নিজেরদের গুরুত্ব কতটা বুঝলো। পরী তার করণীয় করলো, গণমাধ্যম সেটিকে নিয়েই নাচলো ! পরীকে নিয়ে পাঠকের চাহিদা ছিলো হয়তো, টপিকটি এখনকার যুগে ‘ভিউ’ পাবার কন্টেন্ট হয়তো। কিন্তু গণমাধ্যমের যে সমৃদ্ধ ইতিহাস, এতে গণমাধ্যমই চাহিদা তৈরী করে আবার চাহিদার লাগাম ধরে এমনই ছিলো একটা সময়। পরীমনি দেশের চলচ্চিত্রের একজন নায়িকা। একজন বিনোদন কর্মী হিসেবে সাধারণের তুলনায় তার বিষয়টি কিছুটা আলোচনায় আসবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি কতটুকু !

কিছুদিন আগে সাকিব আল হাসান আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি তে ১০০ উইকেট ও ১৫০০ রানের মালিক হয়, যা বিশ্বে একমাত্র। সর্বোচ্চ উইকেট প্রাপ্তির হাতছানিও রয়েছে,যা নিউজিল্যান্ডের সাথে চলতি সিরিজেই হয়তো স্পর্শ করবে। আন্তর্জাতিক সব ফরম্যাট মিলিয়েও অলরাউন্ডার হিসেবে নানা রেকর্ডের কাছাকাছি এই বাংলাদেশি ক্রিকেটার। এই খবরটি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি আমাদেরকে করেছে গর্বিত। এই খবরটি কি ঠিক এতোটা গুরুত্ব পেয়েছে গণমাধ্যমে ! গণমাধ্যম দিলে তো সাধারণ মানুষ দিবে তাইনা । এতো গেলো সাকিব, যে কিনা বর্তমান সময়ে দেশের সব বিভাগে সবচেয়ে বড় তারকা, যা আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত।

দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান সহ সিনিয়র লেভেলের প্রায় সব নেতাই রাজনৈতিক সংগ্রামের কারণে জেলে গেছেন, মুক্তও হয়েছেন । তারা কি তখন এতোটা কাভারেজ পেয়েছিলেন ! আমার স্মৃতিতে আসেনা ।

ছোটবেলার কথা, বর্তমানের দেশের বহুল জনপ্রিয় একটি দৈনিকে আমাদের সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার একটি খবর ছাপা হয়েছিলো। বহু কষ্টে, দেন দরবার করে এখানকার প্রতিনিধি সেটি ছাপাতে অনুরোধ করেছিলেন। সব মিলিয়ে লাইন পাঁচেক। এও যেন বিশাল কিছু ছিলো আমাদের জন্য। কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধতার জন্য অনেক সম্ভাবনা, সমস্যা ও সৃষ্টির কথা স্থানই পায়না। সেই একই দৈনিকে দেখলাম পরীমনির মুক্তি নিয়ে নানা খবর,নানা আপডেট সহ ! অনলাইন সংস্করণ এসে হয়তো জায়গার ঘাটতি কমিয়েছে, কিন্তু তাও মফস্বলের কতো শত খবর ছাপার যোগ্যতা পায়না,সেটি সকল গণমাধ্যম কর্মীই জানেন। জানিনা কি মানদন্ডে খবর হবার এসব যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয় ।

এতো কথার একটিই লক্ষ্য, পরীমনি অপরাধ করেছে, তিনি আইনের আওতায় আসবেন,এটি স্বাভাবিক বিষয় ছিলো। তবে যে স্টাইলে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটি অনেকটা অপ্রয়োজনীয় ছিলো হয়তো ।

তিনি আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের জন্য হয়তো একটি সম্পদে পরিণত হতে পারেন, ভুল থেকে যদি শিক্ষা নেন। কেননা সিনেমার নায়িকা হিসেবে তার প্রাথমিক কিছু গুন রয়েছে বলে অনেক নামী পরিচালক গণ ইতিমধ্যে মত দিয়েছেন। এসব নিয়ে গণমাধ্যমে আরও কিছু খবর ছাপা হবে, এই প্রত্যাশা থাকছে। একটা সময় সংবাদপত্র ছিলো গণমাধ্যমের প্রধান বস্তু, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে টিভি ও অনলাইন সংস্করণ। তাই পথ দেখাতে হবে গণমাধ্যমকেই, কর্তৃপক্ষ অথবা ব্যক্তি সেসব বিশ্লেষণ করে সেপথে হাঁটবেন ,নিজেকে শুদ্ধ করবেন। পরীমনির ফলোয়ার বেড়ে আকাশ ছুঁয়ে যাবে হয়তো, কিন্তু এখন কিংবদন্তি অভিনেত্রী অথবা নায়িকা হতে হলে তার যে কিছু করণীয় আছে সেসব যেনো তাকে কেউ শিখায়। কেননা দিনশেষে চলচ্চিত্রে মূলত মানুষ ও সমাজের নানা দিক তুলে ধরা হয়, সুতরাং এক অংশে এরাই সমাজের ‘ব্র্যান্ড এম্বাসেডর’।

তাই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এদের থাকা উচিত যথাসম্ভব সচেতন ও সকল বিতর্কের বাহিরে। শুভবুদ্ধির উদয় হোক, সেটি উদয় ঘটাতে কাজ করুক আমাদের গণমাধ্যম। গণমাধ্যম আবারও হয়ে উঠুক গণমানুষের । ধন্যবাদ সবাইকে।
সম্পাদনা:আরএইচ/এইচআর

আপনার মতামত দিন

Android App
Android App
Android App
© Natun Feni. All rights reserved. Design by: GS Tech Ltd.