যেতে যেতে পথে গাঙ্গচিলদের সাথে • নতুন ফেনীনতুন ফেনী যেতে যেতে পথে গাঙ্গচিলদের সাথে • নতুন ফেনী
 ফেনী |
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১০ আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

যেতে যেতে পথে গাঙ্গচিলদের সাথে

হোসাইন আরমান, সিনিয়র সাব এডিটরহোসাইন আরমান, সিনিয়র সাব এডিটর
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, ১৭ নভেম্বর ২০২০

সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে সবচেয়ে মনোরম দৃশ্য হলো জাহাজ চলার সাথে সাথে গাঙ্গচিলদের উড়ে চলা । জীবনে একবারই গিয়েছিলাম নীল সাগরের দ্বীপে। সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে প্রতিদিন যে কয়টি জাহাজ ছাড়ে, সবগুলো একই সময়ে ছাড়ে আবার বিকেল সাড়ে ৩টায় ফিরে আসে। জাহাজে আমাদের আসন ছিলো একদম উপরের তলায়। সবচেয়ে মজার বিষয়- এই তলা পুরোটা খোলা ছিলো। অর্থাৎ জানালা দিয়ে প্রকৃতি দেখতে হবে না, সরাসরি দেখা যাবে। জাহাজের সামনে-পেছনে, ডান-বাম উভয় পাশ থেকে সবকিছু সুন্দরভাবে দেখা যাচ্ছিলো।

যথাসময়ে ভো-ভো আওয়াজ করে নাফ নদীতে জাহাজ চলতে শুরু করলো। নাফ নদীর বুককে দ্বিখণ্ডিত করে জাহাজ তার গন্তব্যের দিকে ছুটে চললো। এই নদী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তকে আলাদা করেছে। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সীমান্ত আর কাঁটাতারের বেড়া জানান দিচ্ছিলো, আমরা মিয়ানমারের প্রতিনিধি। সবুজের মাঝে কিছুদূর পর পর ওয়াচ টাওয়ারগুলো স্বগর্বে দাঁড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলো। নাফ নদীর দু’পাশের অবারিত মনকাড়া, অপরূপ সবুজের দৃশ্য দেখলে বোবা মানুষও হয়তো চিৎকার দেবে।

সাগরে গাঙচিলের আনাগোনা বেশ পুলকিত করে সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের। টেকনাফ জেটি থেকে জাহাজ রওনা হওয়ার পর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের পর থেকেই গাঙচিলগুলো জাহাজের সাথে সাথে উড়তে থাকে। সৌন্দর্যের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় জাহাজের পেছনে ছুটে চলা গাঙচিলগুলো। গাঙচিল জাহাজের দু’পাশে উড়তে থাকে। মনে হচ্ছে যেন, তারা পর্যটকদের অভিনন্দন জানাচ্ছে। আবার মনে হয় এই বুঝি একদল দস্যু জাহাজ তাড়া করছে।

গাঙচিলের ঝাঁক দেখে সবাই তখন সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তাদের ধরার চেষ্টা করে। পর্যটকরা তাদের চিপস ছুড়ে মারে। ওরাও জন্টি রোডসের মত মুখ দিয়ে ক্যাচ ধরার চেষ্টা করে। কেউ ধরতে পারে কেউ পারে না। চিপস খাওয়ার জন্য নিজেদের মাঝে প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়ে যায়। ছুড়ে মারা চিপস পানিতে পড়ে গেলে পানি থেকে সাথে সাথে তুলে নেয়।

নদীর বুকে গাঙচিল থাকবে এটি বাংলার প্রকৃতির একটি অংশ। এই গাঙচিলের দেখা মেলে বাংলার প্রায় প্রতিটি নদীতে। তবে বাংলা আর আরাকানের মাঝে বয়ে যাওয়া নাফ নদীতে গাঙচিল যেন আমাদেরকে বলে দেয় অন্যরকম এক ভালোলাগার কথা।জাহাজের বাইরে রেলিংয়ে দাঁড়ালেই দেখা যায় ঝাঁকে ঝাঁকে গাঙচিল। জাহাজের সামনে-পেছনে ছুটে আসছে একেবারে মাঝসমুদ্র পর্যন্ত। আবার সেন্টমার্টিন থেকে ফেরার পথেও মাঝসমুদ্র পর্যন্ত এসব গাঙচিল ছুটে আসে জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে। এ যেন আত্মীয়স্বজনকে বাড়িতে সম্ভাষণ জানানো আর বিদায়ের একটি চমত্কার মুহূর্ত। কেউ কেউ এই সম্ভাষণের প্রতিদানে চড়া দামে জাহাজ থেকে চিপস কিনে তাদেরকে খেতে দিচ্ছে। খাবার পেয়ে সম্ভাষণ জানাতে আসা কিংবা বিদায় জানাতে আসা মেজবান গাঙচিলদের আনন্দ তখন আর দেখে কে! এ কারণে গাঙচিলগুলো উড়তে উড়তে চলে আসে একেবারে হাতের নাগালে।

গাঙ্গচিলের সাথে খেলাতে মেতে যায় জোয়ান-বুড়ো সবাই। যাত্রীরা নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে গাঙ্গচিলদের সাথে চিল করতে জাহাজের পাশে দাড়ায়। তাদেরে সাথে মজা করতে হলে উপঢৌকন দিতে হয় অথাৎ তাদেরকে চিপস খাওয়াতে হয়। বিনিময়ে তারা মুখ দিয়ে ক্যাচ ধরা দেখাবে, জেট বিমানের মত নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করার ভঙ্গি দেখাবে।

পর্যটকরা যেহেতু বাহির থেকে চিপস নেয়না তাই জাহাজ থেকে চড়া দামে কিনতে হয় মজা নেয়ার জন্য। পাখিরা কিভাবে যেন বুঝতে পারে ওরা চিপস ছাড়া অন্য কিছু তেমন খায়না। ওরা সব সময় অপেক্ষা করে কখন জাহাজ ছাড়বে আর ভিন্ন স্বাদের খাবারে স্বাদ নিবে। যেমনটা আমরা অপেবক্ষা করি কোন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গেলে। পাখিরাও নিজেদের স্বার্থ বুঝে যতক্ষন খাবার ছুড়ে দিবে ততক্ষন উড়তে থাকবে। কিছুক্ষন খাবার না দিলে আবর সংখা কমে যেতে থাকে।

জাহাজ থেকে সেন্টমার্টিনের জেটি দেখা যাচ্ছে…

নাফ নদী পেরিয়ে জাহাজ যখন সমুদ্রের মোহনায় প্রবেশ করে; তখন মনে হয় যেন আমরা কোন নীল রঙের খনিতে প্রবেশ করি। কাঁচের মত স্বচ্ছ নীল পানিতে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে- নারিকেল আর ঝাউ গাছের সারি বেষ্টিত নীলের মাঝে একখণ্ড সবুজ। গল্পের যাদুকর হৃমায়ূন আহমেদের সেই ‘দারুচিনি দ্বীপ’।

সম্পাদনা:আরএইচ/এইচআর

আপনার মতামত দিন

Android App
Android App
Android App
© Natun Feni. All rights reserved. Design by: GS Tech Ltd.