দেশি মাছ রক্ষার উপায় • নতুন ফেনীনতুন ফেনী দেশি মাছ রক্ষার উপায় • নতুন ফেনী
 ফেনী |
১৭ জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩ মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

দেশি মাছ রক্ষার উপায়

ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহ্‌ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহ্‌
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৭:৩৫ অপরাহ্ণ, ২৮ আগস্ট ২০২০

মাছ আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। খাদ্য, পুষ্টি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মাছের ভূমিকা বেড়ে চলেছে। জিডিপিতে মাছের অবদান ৩.৫৭ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপিতে ২৫.৩০ শতাংশ এবং দেশের রপ্তানি খাতে ২ শতাংশেরও অধিক। প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। প্রায় এক কোটি ৭৮ লাখ মানুষ এ খাতে নিয়োজিত; এর হার মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশেরও বেশি, যার মধ্যে ১৪ লাখেরও বেশি নারী। দেশে মুক্ত ও আবদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৭ লাখ হেক্টর।

সাম্প্রতিককালে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও মোট উৎপাদনে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদন তুলনামূলক ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। সমুদ্র অঞ্চলের আহরণের তুলনামূলক অবদানও বিগত ১০ বছর স্থিতাবস্থায় আছে অথবা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টন এবং চাষে উৎপাদন হয়েছে ২৪ লাখ টন। অথচ সত্তর-আশির দশকে মুক্ত জলাশয়ের অবদান ছিল ৭০ শতাংশের মতো।

চাষে উৎপাদন বাড়লেও মুক্ত জলাশয়ের অবদান কমে যাওয়া ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নির্দেশ করে। দেশি মাছের বিলুপ্তির সম্ভাব্য কারণ তাতেই খুঁজতে হবে। মুক্ত জলাশয়ের সার্বিক আন্তঃসেক্টর ব্যবস্থাপনা-পরিকল্পনায় ভুল বা দুর্বলতা থাকলেও তা খুঁজে দেখতে হবে। মাছ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রধানত দুই প্রকার- চাষ ব্যবস্থাপনা ও আহরণের সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা। মৎস্য সম্পদের আহরণ ব্যবস্থাপনা তথা প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি পুষিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা না গেলে দেশি মাছের বিলুপ্তি এড়ানো যাবে না।

মুক্ত জলাশয়ের পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে মৎস্য জীববৈচিত্র্য এখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মৎস্য জীববৈচিত্র্যে প্রতিবেশিক এবং জীব-বৈজ্ঞানিক ইমপ্যাক্ট বিষয়ে আমাদের উপলব্ধি প্রয়োজন।

কৃষির সঙ্গে মাছের স্বার্থের সংঘাতটি এই যে, প্লাবনভূমি, বিল-হাওরের পাকা-আধা পাকা ধান বন্যার প্রাথমিক প্লাবনে ডুবে গিয়ে ধানের ক্ষতি হয় অথচ মাছের প্রজননের জন্য প্লাবন প্রয়োজন। কিন্তু উচ্চফলনশীল ধান চাষের লক্ষ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণে বহু আগেই প্রধান সব নদীর দু’পাড়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। মৌসুমের প্রথম বন্যায় প্রজননের উদ্দেশ্যে প্লাবনভূমির মাছ স্রোতের প্রতিকূলে মাইগ্রেশন করে এবং নদীর দু’কূলের প্লাবিত অগভীর পানিতে ডিম ছেড়ে দেয়। নিষিক্ত ডিম থেকে সৃষ্ট পোনা মাছ সেখানে প্রাপ্ত প্রচুর প্রাকৃতিক খাদ্য খেয়ে দ্রুত বড় হয়।
https://web.facebook.com/emakers.xyz/
পরে প্লাবনভূমির পানি শুকাতে থাকলে ওইসব ব্রুড মাছ ও নতুন উৎপন্ন মাছ প্লাবনভূমির গভীর অংশে আশ্রয় নেয়। শীতের মৌসুমে এসব জলাশয়ে জেলেরা মাছ ধরে এবং অবশিষ্ট মাছ পরের মৌসুমের প্লাবনে প্রজননের জন্য একইভাবে মাইগ্রেশন করে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের কারণে মাছের প্রজনন মাইগ্রেশন থেমে যাওয়ায় মৎস্য জীববৈচিত্র্যের নিদারুণ ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনায় মাছের স্বার্থ তেমন বিবেচনায় থাকলে আপস রফা হতে পারত; কিন্তু তা হয়নি। এ ছাড়া বিল, হাওর ভরাট হওয়া, পানি সেচ কাজে ব্যবহারের ফলে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া, কীটনাশকের ব্যবহারে পানিদূষণ, অতি আহরণ, এমনকি পানি শুকিয়ে সব মাছ ধরে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে প্রজনন-মাইগ্রেশন ও মৎস্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়েছে।

মাছের পারফরম্যান্স ও ওয়েলবিইংয়ের জন্য জেনেটিক উপাদান এবং পরিবেশের উপাদান আদর্শিক অবস্থায় থাকা দরকার। উভয় উপাদানের অভাবে মাছ প্রকৃতিতে টিকে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আইইউসিন ২০০০ সালে এবং ২০১৫ সালে যথাক্রমে এদেশের ২৬৬ ও ২৫৩ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের অবস্থা পরিমাপ করে ৫৪টি এবং ৬৪টিকে থ্রেটেন্ড বলে চিহ্নিত করেছে। ১৪ বছরে থ্রেটেন্ড প্রজাতির সংখ্যা ৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৫ সালের ৬৪টি থ্রেটেন্ড প্রজাতির মধ্যে ৯টিকে তারা ক্রিটিক্যালি ইনড্যানজারড, ৩০টিকে ইনড্যানজারড এবং ২৫টিকে ভালনারেবল চিহ্নিত বলে করেছে।

এ তালিকায় বোয়াল, চিতল, ফলি, আইড়, বাগাইড়, পাঙাশ, গজার, কালিবাউশ, সরপুঁটি, মেনি, কাজলি, চাপিলা, চেলা, ঢেলা, রানী, তারাবাইম ইত্যাদি রয়েছে। উপরোল্লিখিত আলোচনায় এ সেক্টরের কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার দুর্বলতাই নির্দেশ করে। মাছের চাষে যেমন জোর দেওয়া হয়েছে, আহরণের পরিবেশ উন্নয়নে বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম তেমন নেওয়া হয়নি। ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রজনন ক্ষেত্রগুলো পুনরুদ্ধার এবং বিল, হাওর ও প্লাবনভূমির সঙ্গে নদীর সংযোগ এবং স্লুইস গেটের ব্যবস্থাপনায় মাছের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে মাছের মাইগ্রেশনের সুরাহা করতে হবে।

মৎস্য ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ কাজে নানা রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়ে থাকে। দেশের মোহনা অঞ্চলের নদীগুলোতে বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাডাপ্টিভ কো-ম্যানেজমেন্ট এবং জেলেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক-প্রতিবেশিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে চলমান ইকো ফিশ প্রকল্পে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ এবং পরে জাটকা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। এ ছাড়া নদীগুলোতে অন্যান্য মাছের প্রাপ্যতাও বেড়েছে (বার্ষিক রিপোর্ট, বাংলাদেশ মৎস্য বিভাগ, ২০১৮)। ইকো ফিশ প্রকল্পের আদলে পদ্মা, যমুনা এবং মেঘনা নদীর সম্পূর্ণ অংশে জরিপ করে প্রাপ্ত গভীর সেকশনগুলোতে কনজারভেশন কার্যক্রম চালাতে হবে। তেমনি পাইলট হলেও কিছু বিল, যেখানে দেশি মাছের ব্রিডিং মাইগ্রেশন এখনও সংঘটিত হয়, যেমন চলনবিলে জোরদার কনজারভেশনের লক্ষ্যে প্রকল্প নিতে হবে। মুক্ত জলাশয়ের বায়োডাইভারসিটি নাজুক রেখে চাষ উন্নয়ন করে যেমন মাছ উৎপাদনের স্থিতিশীলতা রক্ষা সম্ভব নয়, তেমনি দেশি মাছের বিলুপ্তিও এড়ানো যাবে না। দেশি মাছের বিলুপ্তি ঠেকাতে পরিবেশ-প্রতিবেশের সার্বিক উন্নয়ন ঘটিয়ে সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে; এ ক্ষেত্রে কেবল সংরক্ষণ, সংরক্ষণ এবং সংরক্ষণের কথাই ভাবতে হবে।
লেখক : সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট; উপাচার্য, বেসরকারি ফেনী ইউনিভার্সিটি

আপনার মতামত দিন

Android App
Android App
Android App
© Natun Feni. All rights reserved. Design by: GS Tech Ltd.